মোরসালিন আহমেদ

আন্তর্জাতিকমাস্টার মোহাম্মদ ফাহাদ রহমান চলতি বছর ঘরোয়া দাবায় বিশেষ করে প্রিমিয়ার ডিভিশন দাবা লিগে বাংলাদেশ পুলিশ এবং বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ গেমসে বাংলাদেশ আনসারের হয়ে দলগত শিরোপা জিতলেও ইনডিভিজুয়েল ইভেন্টে সফল হতে পারছিলেন না। একের পর এক কখনো অনলাইন প্লাটফর্মে কিংবা অন বোর্ডে একটু-আধটু’র জন্য কাঙ্খিত সাফল্য ঘরে তুলতে পারছিলেন না। অবশেষে ওয়ালটন আন্তর্জাতিক রেটিং দাবা প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ পুলিশের এ কৃতি দাবাড়– চ্যাম্পিয়ন হয়ে নিজেকে ফের মেলে ধরলেন। তিনি ৯ ম্যাচে ৮ জয় আর এক পরাজয়সহ ৮ পয়েন্ট পেয়ে এ কৃতিত্ব দেখান। ফাহাদ অবশ্য চতুর্থ রাউন্ড থেকে শিরোপা লড়াইয়ে খানিকটা পিছিয়ে পড়েছিলেন। তবে দৃঢ প্রত্যয় নিয়ে প্রতিটি ম্যাচ ভাল খেলায় শিরোপা রেসে ফিরে আসার সম্ভাবনা তৈরি হয়। অষ্টম রাউন্ডটি তাঁর জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ ছিল, একই সঙ্গে শিরোপা জয়ের টানিং পয়েন্ট ছিল। সেটিকে চমৎকারভাবে কাজে লাগিয়ে তিনি সাফল্যের মুখ দেখেন। ওই রাউন্ডে যদি ফাহাদ গ্র্যান্ডমাস্টার জিয়াউর রহমানকে হারাতে না পারতেন তাহলে রানারআপ লড়াই থেকেও ছিটকে যেতে পারতেন। ফাহাদ শিরোপা জয়ের পথে বাবলু শেখ, মোহাম্মদ শামীম এবং মো. আমিনুল ইসলাম প্রথম তিন ম্যাচে জয় পান। কিন্তু চতুর্থ রাউন্ডে ফিদেমাস্টার মেহেদি হাসান পরাগের সঙ্গে হেরে যাওয়ায় খানিকটা পিছিয়ে পড়েছিলেন। তবে পঞ্চম থেকে নবম রাউন্ড পর্যন্ত যথাক্রমে ক্যান্ডিডেটমাস্টার মো. শরীফ হোসেন, জাবেদ আল আজাদ, মো. আবু হানিফ, গ্র্যান্ডমাস্টার জিয়াউর রহমান ও ক্যান্ডিডেটমাস্টার তাহসিন তাজওয়ার জিয়াকে পরাজিত চ্যাম্পিয়ন হন। শিরোপা জয়ের ফলে ফাহাদ পঞ্চাশ হাজার টাকা ও ওয়ালটন সামগ্রী লাভ করেন। চলতি মৌসুমে ফাহাদ অবশ্য ইনডিভিজুয়েল ইভেন্টের মধ্যে বিশ^কাপ কাপ ২০২১ কোয়ালিফায়িং এশিয়ান কন্টিনেন্টাল ইনডিভিজুয়াল চেস চ্যাম্পিয়নশিপে ৮২ জনের মধ্যে ২৪তম, এশিয়ান জোনাল ৩.২ জোনে ৩৯ জনের মধ্যে ৫ম. বঙ্গবন্ধু আমন্ত্রণমূলক আন্তর্জাতিক রেটিং দাবা প্রতিযোগিতায় ৪১ জনের মধ্যে ৪র্থ হয়েছিলেন। তবে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ গেমসে তিনি বিøটজ ইভেন্টে ব্রোঞ্জপদক ও র‌্যাপিড ইভেন্টে রৌপ্যপদক জিতেছিলেন। চলতি বছরে ফাহাদের এটিই কোন ইনডিভিজুয়েল ইভেন্টের প্রথম শিরোপা।

এদিকে সারাক্ষণ শিরোপা রেসে এগিয়ে থাকা বাংলাদেশ পুলিশের গ্র্যান্ডমাস্টার জিয়াউর রহমান অবশ্য নিজের ভুল স্ট্র্যাজিডির কারণে খেসারত দিয়েছেন। তিনি সপ্তম রাউন্ড পর্যন্ত শীর্ষে থাকার পর অষ্টম রাউন্ডে ফাহাদের কাছে হেরে তীরে এসে তরী ডুবিয়েছেন। তাঁর প্রথম ভুলটি ছিল চতুর্থ রাউন্ডে পিতা-পুত্রের লড়াইয়ে তাহসিন তাজওয়ার জিয়ার সঙ্গে স্বেচ্ছায় ড্র করা। এটি না করলে শেষ রাউন্ডে সেখ নাসির আহমেদকে হারাতে পারলেও (ফাহাদের কাছে পরাজয় সত্বেও) চ্যাম্পিয়ন হতে পারতেন। কিন্তু ওই দু’টি ড্রই জিয়ার জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। শিরোপা জয়ের লক্ষে জিয়া মো. মনিরুজ্জামান মাসুদ, মহিলা ফিদেমাস্টার নোশিম আঞ্জুম, ক্যান্ডিডেটমাস্টার মাহতাবউদ্দিন আহমেদ রবীন, ক্যান্ডিডেটমাস্টার মনন রেজা নীড়, স্বর্নাভো চৌধুরীকে পরাজিত করেন। শেষ পর্যন্ত ৭ পয়েন্ট সংগ্রহ করে জিয়াকে চারজনের সঙ্গে রানারআপ লড়াইয়ে টাইব্রেকিং পদ্ধতিতে রানারআপ নিয়ে তুষ্ট থাকতে হয়েছে। এর আগে জিয়া বঙ্গবন্ধু আমন্ত্রণমূলক আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে টাইব্রেকিংয়ের ফাঁদে পড়ে রানারআপ হয়েছিলেন। এছাড়া সমান সংখ্যক ৭ পয়েন্ট নিয়ে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর আন্তর্জাতিকমাস্টার মোহাম্মদ মিনহাজউদ্দিন তৃতীয়, বাংলাদেশ নৌবাহিনী ফিদেমাস্টার সুব্রত বিশ^াস চতুর্থ, স্পোর্টস বাংলার ক্যান্ডিডেটমাস্টার সাদনান হাসান দিহান পঞ্চম ও বাংলাদেশ নৌবাহিনীর মহিলা ফিদেমাস্টার নোশিন আঞ্জুম ষষ্ঠ স্থান লাভ করেন।

এদিকে ৬.৫ পয়েন্ট নিয়ে সপ্তম হতে ত্রয়োদশতম হয়েছেন যথাক্রমে উত্তরা সেন্ট্রাল চেস ক্লাবের ক্যান্ডিডেটমাস্টার মনন রেজা নীড়, বাংলাদেশ নৌবাহিনীর ফিদেমাস্টার সেখ নাসির আহমেদ, উত্তরা সেন্ট্রাল চেস ক্লাবের ক্যান্ডিডেটমাস্টার তাহসিন তাজওয়ার জিয়া, বাংলাদেশ আনসারের স্বর্নাভো চৌধুরী, জনতা ব্যাংক অফিসার ওয়েলফেয়ার সোসাইটির গোলাম মোস্তফা ভূঁইয়া, উত্তরা সেন্ট্রাল চেস ক্লাবের মো. আবু হানিফ ও বাংলাদেশ নৌবাহিনীর ক্যান্ডিডেটমাস্টার মাহতাবউদ্দিন আহমেদ রবীন। তবে বিশেষ পুরস্কার পেয়েছেন বাংলাদেশ নৌবাহিনীর মহিলা ক্যান্ডিডেটমাস্টার আহমেদ ওয়ালিজা, বাংলাদেশ নৌবাহিনীর কাজী জারিন তাসনিম, সেরা অনুর্ধ্ব-২০ বিভাগে এলিগেন্ট ইন্টারন্যাশনাল চেস একাডেমির তাহমিদুল হককে, অনুর্ধ্ব-১৬ বিভাগে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর ওয়াদিফা আহমেদ এবং অনুর্ধ্ব-১২ বিভাগে আর্থার ইউসুপভ ট্রেনিং গ্রæপের সাকলাইন মোস্তফা সাজিদ। সেরা আনরেটেড পুরস্কার লাভ করেন সংগ্রাম দাস।

জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের শহীদ ক্যাপ্টেন কামাল অডিটোরিয়াম লাউঞ্জ ও বাংলাদেশ দাবা ফেডারেশনের ক্রীড়াকক্ষে গত ১৫-২৩ জুন পর্যন্ত ৯ রাউন্ড সুইস লিগ পদ্ধতিতে ১২৫ জন খেলোয়াড় অংশগ্রহণ করেন। টুর্নামেন্টের চিফ আরবিটার ছিলেন শাহজাহান কবীর। তাঁর ডেপুটি ছিলেন তনিমা পারভীন। আরবিটার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন কাজী তাহেরুল ইসলাম, রিয়াসাত-ই নূর এবং রোমানা ফেরদৌস। বিজয়ীদের মোট নগদ দুই লক্ষ টাকা ও ওয়ালটন সামগ্রী পুরস্কার দেয়া হয়। ২৪ জুন বাংলাদেশ দাবা ফেডারেশনের ক্রীড়াকক্ষে পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠিত হয়। ওয়ালটন গ্রæপের নির্বাহী পরিচালক ও হেড অব গেমস এন্ড স্পোর্টস এফএম ইকবাল বিন আনোয়ার ডন প্রধান অতিথি হিসেবে বিজয়ীদের মধ্যে পুরস্কার বিতরণ করেন। বাংলাদেশ দাবা ফেডারেশনের সহসভাপতি ও টুর্নামেন্ট কমিটি চেয়ারম্যান কেএম শহিদউল্যা’র সভাপতিত্ব অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ দাবা ফেডারেশনের যুগ্মসম্পাদক মাসুদুর রহমান মল্লিক দিপু।

সৌজন্যে : পাক্ষিক ক্রীড়াজগত
বর্ষ ৪৪ # সংখ্যা ১৭ # ১ জুলাই ২০২১